ফেনীর সড়কে থামছেনা মৃত্যুর মিছিল, পাঁচ মাসে ঝরেছে ২২ প্রাণ

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ফেনীর ২৬ কিলোমিটার সড়কে এবং কয়েকটি অভ্যন্তরীণ সড়কে লাফিয়ে বাড়ছে সড়ক দুর্ঘটনা। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে মাসের মাঝে এই পাঁচ মাসে সড়কে ঝরেছে ২২ তাজা প্রাণ। সংশ্লিষ্টদের মতে বেপরোয়া গতি ও ট্রাফিক আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগের অভাবে দীর্ঘ হচ্ছে মৃত্যুর মিছিল।

মহাসড়কের ফাজিলপুর ও মহিপাল হাইওয়ে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে মাসের মাঝে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ও কয়েকটি অভ্যন্তরীণ সড়কে ১৫টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২২ জনের মৃত্যু হয়েছে। তারমধ্যে ফাজিলপুর অংশে ৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১১ জনের মৃত্যু হয়। নিহত ১১ জনের মধ্যে ৬ জনই পথচারী। এছাড়া মহিপাল হাইওয়ে থানার আওতাধীন এলাকায় চলতি বছরের পাঁচ মাসে ৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৭ জন নিহত হয়েছেন। এসব ঘটনায় ৬টি গাড়ি পুলিশ হেফাজতে রয়েছে।

এদিকে জেলায় সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতের নির্দিষ্ট কোন পরিসংখ্যান বা তথ্য না পাওয়া না গেলেও বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, মহাসড়ক ছাড়াও জেলার বিভিন্ন সড়কে চলতি বছরের পাঁচ মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় অন্তত আরও ৩ থেকে ৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। এসব দুর্ঘটনায় হতাহতের সংখ্যাও অনেক। নিহতের মধ্যে বেশিরভাগই কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থী, পথচারী ও মোটরসাইকেল আরোহী ছিলেন। এই সময়ের মাঝে মোটর বাইক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান ৪ জন যুবক।

জেলায় চলতি বছরে বিভিন্ন সড়ক দুর্ঘটনার তথ্য পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, অতি সম্প্রতি পৃথক দুর্ঘটনায় একজন ব্যাংক কর্মকর্তা ও এক কলেজ ছাত্র প্রাণ হারান। গত ১২ মে তারিখে ফুলগাজীতে পিকআপ চাপা পড়ে একজন নিহত হন। ১৪ মে ফাজিলপুরে রাস্তা পার হতে গিয়ে মারা যায় লামিয়া নামের এক স্কুল ছাত্রী। ১৬ এপ্রিল পরশুরামে মোটর সাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান এক যুবক। ৪ মার্চ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের লাটিমি রাস্তায় মাথায় রাস্তা পারাপারের সময় বিপরীত দিক থেকে মাইক্রোবাসের ধাক্কায় গুরুতর আহত হন জয়নাল হাজারী কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী নিঝুম আক্তার। পরে চট্টগ্রামের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

এর আগে গত ২৭ ফেব্রæয়ারি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের লেমুয়া রাস্তার মাথায় বেপরোয়া গতিতে মোটরসাইকেল চালানোর সময় বিপরীত দিক থেকে আসা ইটভাঙার ট্রলির সঙ্গে সংঘর্ষে এক কলেজ ছাত্রের মৃত্যু হয়। নিহত মোটরসাইকেল আরোহীর নাম মুশফিক উস সালেহীন মাহিন (২১)। তিনি ফেনী সদর উপজেলার ফরহাদনগর ইউনিয়নের দক্ষিণ ভোরবাজার এলাকার সৌদি প্রবাসী এম এন মাজেদ ও সাহেদা আক্তারের ছেলে। মাহিন ইনস্টিটিউট অব কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড টেকনোলজির (আইসিএসটি) ৩য় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন।

গত ২৬ ফেব্রæয়ারি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের দেবীপুর ও কসকা এলাকায় পৃথক দুর্ঘটনায় তিনজন নিহত হয়েছেন। নিহতরা হলেন, লহ্মীপুরের রামগতি উপজেলার চর আলগী গ্রামের বশির মাঝির ছেলে মো. আবু বক্কর ছিদ্দিক (২২) এবং ভোলার লালমোহন উপজেলার রায়চাঁদ বাড়ির মো. ফজলুল হকের ছেলে মো. ইয়ামিন, মহিপালের রিজভী আহমেদের ছেলে কমল।

এর আগে ২৩ ফেব্রæয়ারি মহাসড়কের ফেনীর মহিপাল এলাকায় পেছন থেকে দ্রæতগামী কাভার্ড ভ্যানের ধাক্কায় একটি সবজিবাহী পিকআপের চালক নিহত হয়েছেন। এ সময় পিকআপের সামনের অংশে থাকা দুই যাত্রী আহত হন। নিহত পিকআপ চালকের নাম মো. মহি উদ্দিন (৩৫)। তিনি চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার খৈয়াছড়া এলাকার বাসিন্দা।

৯ ফেব্রæয়ারি ফেনী পৌরসভার সুলতানপুর এলাকার আমিনবাজার সড়কে মাটিকাটার স্কেভেটর বহনকারী ট্রাক্টরের সঙ্গে সিএনজিচালিত অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে ১৩ বছরের এক কিশোর নিহত হয়েছেন। একই ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও পাঁচ জন। এ ঘটনায় নিহত লিমন (১৩) ছাগলনাইয়া উপজেলার পাঠাননগর ইউনিয়নের জসিমের ছেলে।

গত ৬ ফেব্রæয়ারি বিকেলে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ফেনী সদর উপজেলার ফাজিলপুর এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় মইনুল ইসলাম রাহাত (১৯) নামের এক কলেজ শিক্ষার্থী নিহত হয়েছেন। নিহত রাহাত ফাজিলপুর মাদ্রাসা রোডের ওয়ালী ভূঞা বাড়ির শিবপুর আরবি হাট উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক আবুল কাশেমের ছোট ছেলে। তিনি ফাজিলপুর সাউথইস্ট ডিগ্রি কলেজের উচ্চ মাধ্যমিক দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন।

৪ ফেব্রæয়ারি মহাসড়কের ফাজিলপুর এলাকায় যাত্রীবাহী বাস ও পিকআপের মুখোমুখি সংঘর্ষে এক পিকআপ চালক নিহত হয়েছেন। তার নাম মো. সাহাব উদ্দিন (২৪)। তার আগে ৩ ফেব্রæয়ারি রাতে ফেনী-সোনাগাজী আঞ্চলিক সড়কের কলঘর এলাকায় দ্রæতগামী মোটরসাইকেলের ধাক্কায় নুরুল আমিন (৬৫) নামের এক পথচারী নিহত হন।

এর আগে ৩১ জানুয়ারি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সদর উপজেলার বিসিক রাস্তার মাথা এলাকায় রিকশায় অজ্ঞাত গাড়ির ধাক্কায় এক তরুণ নিহত হয়েছেন। নিহত ইহাদুল ইসলাম (২০) উপজেলার লেমুয়া ইউনিয়নের লেমুয়া গ্রামের মো. স্বপন মিয়ার ছেলে। তিনি ফাজিলপুর সাউথইস্ট ডিগ্রি কলেজের উচ্চ মাধ্যমিক দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলেন।

চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি শহরের ট্রাংক রোডের দাউদপুর পুল এর পাশে কাঁচাবাজার এলাকায় লেগুনার সঙ্গে মোটরসাইকেলের সংঘর্ষে এক পথচারী কিশোর নিহত হয়েছেন। তার নাম মো. নিশাত (১৫)। নিশাত সোনাগাজী উপজেলার বাংলাবাজার এলাকার কাটাখিলা গ্রামের বাসিন্দা। তিনি ফেনী শহরের একটি মাদ্রাসার নবম শ্রেণির ছাত্র ছিলেন।

১৬ জানুয়ারি ভোরে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ফেনীর ছাগলনাইয়া উপজেলার মুহুরীগঞ্জের পাশে কবরস্থান নামক এলাকায় এক সড়ক দুর্ঘটনায় অজ্ঞাত নারীর মৃত্যু হয়। খবর পেয়ে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ও সিআইডির টিম মর্গে ওই নারীর আঙুলের ছাপ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষাশেষে তার পরিচয় শনাক্ত করেন। ওই নারীর নাম বুলু বিশ্বাস (৩৫)। তিনি মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার বাজিতপুর ইউনিয়নের কাকৈরখোপা এলাকায় চিত্তরঞ্জন বিশ্বাসের মেয়ে এবং একই এলাকার নকুল বকতের স্ত্রী ছিলেন।

মহাসড়কের ফাজিলপুর অংশে দুর্ঘটনা বাড়ার কারণ জানতে চাইলে ফাজিলপুর হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মো. রাশেদ খান চৌধুরী ‘কালের কন্ঠ’কে বলেন, চলতি বছরে মহাসড়কের ফাজিলপুর অংশে ৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১১ জনের মৃত্যুর তথ্য পুলিশের কাছে এসেছে। এ স্থানে পথচারী পারাপার ও বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানোর কারণে দুর্ঘটনা বেশি ঘটছে। নিহতদের মধ্যে ৭ জনই ছিলেন পথচারী।

এ ব্যাপারে মহিপাল হাইওয়ে পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মোস্তফা কামাল বলেন, চলতি বছরে মহিপাল হাইওয়ে থানা পুলিশের আওতাধীন এলাকায় ৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এসব ঘটনায় ৬টি গাড়ি পুলিশ হেফাজতে রয়েছে।

নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) এর ফেনী জেলা শাখার সভাপতি শহিদুল ইসলাম বলেন, সড়কে চলাচলরত গাড়ি চালকদের শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও দক্ষতার অভাবে দুর্ঘটনা বাড়ছে। এছাড়াও ফেনীর আয়তনের তুলনায় সড়কে যানবাহনের সংখ্যা অনেক বেশি। সা¤প্রতিক সময়ে সড়কে বেপরোয়া গতিতে মোটরসাইকেল চালানোর কারণে দুর্ঘটনা বাড়ছে। মহাসড়কে হাইওয়ে পুলিশের যথাযথ নজরদারি থাকলে দুর্ঘটনা কমিয়ে আনা সম্ভব হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

ফেনী প্রতিনিধি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *